
একটি অজ্ঞাত সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য—সেখান থেকেই শুরু হয় অনুসন্ধান, যা শেষ পর্যন্ত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মেটার জন্য বড় আইনি ধাক্কা হয়ে দাঁড়ায়। যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান সম্প্রতি এ বিষয়ে একটি বিস্তৃত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২১ সালে, যখন করোনাভাইরাস মহামারির কারণে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে মানুষের উপস্থিতি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। সেই সময় সাংবাদিকদের কাছে আসে উদ্বেগজনক তথ্য—যুক্তরাষ্ট্রে শিশু পাচারের ঘটনা বেড়ে যাচ্ছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম, এসব অপরাধে ব্যবহৃত হচ্ছে।
এই তথ্যের ভিত্তিতে মানবাধিকার বিষয়ক সাংবাদিক মে-লিং ম্যাকনামারার সঙ্গে যৌথভাবে অনুসন্ধান শুরু হয়। বিভিন্ন সংস্থা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা জানান, অপরাধীরা মূলত মেসেঞ্জার বা ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে কিশোর-কিশোরীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে। প্রথমে বিশ্বাস অর্জন, এরপর শোষণ—এই ধাপেই পরিচালিত হচ্ছিল পুরো প্রক্রিয়া।
তদন্তে উঠে আসে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন ফিচার ব্যবহার করে শিশুদের পাচারের মতো গুরুতর অপরাধ সংঘটিত হচ্ছিল। কোথাও দরকষাকষির আলাপ, কোথাও আবার ছবি ব্যবহার করে বিজ্ঞাপন—সবই ঘটছিল অনলাইনে। অথচ এসব কার্যক্রম যথাসময়ে শনাক্ত বা প্রতিরোধ করতে পারেনি মেটা—এমন অভিযোগ উঠে এসেছে।
এছাড়া, কনটেন্ট মডারেশন বিভাগের সাবেক কর্মীরা জানিয়েছেন, তারা নিয়মিত ভয়াবহ কনটেন্টের মুখোমুখি হতেন এবং মানসিকভাবে চাপে থাকতেন। তবে গুরুতর অভিযোগ জানানো হলেও অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তারা।
তদন্তের অংশ হিসেবে পাচার থেকে বেঁচে ফেরা ব্যক্তিদের সঙ্গেও কথা বলেন সাংবাদিকরা। একটি নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে জানা যায়, কীভাবে সামাজিক মাধ্যমকে ব্যবহার করে শিশুদের টার্গেট করা হয়। এমনই এক ঘটনায় ‘মায়া’ নামের এক কিশোরীর করুণ পরিণতির কথাও উঠে আসে, যিনি অনলাইনে পরিচয়ের পর প্রাণ হারান।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রসিকিউটরের দপ্তর থেকে জানা যায়, সামাজিক মাধ্যমে শিশু পাচারের ঘটনা প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। বিশেষ করে মহামারির সময়ে শিশুদের অনলাইন নির্ভরতা বাড়ায় অপরাধীদের জন্য কাজটি সহজ হয়ে ওঠে।
এই অনুসন্ধানের ফল ২০২৩ সালে প্রকাশিত হলে তা পরবর্তীতে আদালতে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল মেটার বিরুদ্ধে মামলা করেন, যেখানে অভিযোগ করা হয়—তাদের প্ল্যাটফর্ম অপরাধীদের জন্য এক ধরনের ‘বাজারে’ পরিণত হয়েছে।
চলতি বছরের মার্চে আদালত মেটাকে ৩৭৫ মিলিয়ন ডলার জরিমানা করার রায় দেয়। যদিও প্রতিষ্ঠানটি রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের ঘোষণা দিয়েছে এবং ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।
তবে বিতর্ক এখানেই শেষ হয়নি। অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, মেসেঞ্জার ও মেটা পে ব্যবহার করে অবৈধ লেনদেনের অভিযোগ। এছাড়া এনক্রিপশন চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েও সমালোচনা তৈরি হয়েছে, কারণ এতে অপরাধ শনাক্তকরণ আরও কঠিন হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা প্রযুক্তির অপব্যবহারের এক ভয়াবহ উদাহরণ। শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি, জবাবদিহি এবং কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নের দাবি আরও জোরালো হচ্ছে।
(গত বছর সিনেট কমিটির শুনানিতে মেটা-র প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ। ছবি: সংগৃহীত)