(ছবি-সংগৃহীত)

ওয়ার্ল্ডনিউজবিডি২৪ ডেস্ক

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্বের আশঙ্কা তুলে বিরোধীদের তীব্র আপত্তির মধ্যেই সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় ও বিচারক নিয়োগসংক্রান্ত অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা তিনটি অধ্যাদেশ বাতিল করেছে জাতীয় সংসদ।

বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে আলাদা দুটি বিল পাসের মাধ্যমে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর মধ্যে ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ রহিতকরণ বিল, ২০২৬’ পাসের মাধ্যমে বিচারক নিয়োগসংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়েছে। একইসঙ্গে ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় রহিতকরণ বিল, ২০২৬’ পাস করে সচিবালয় সংক্রান্ত মূল অধ্যাদেশ ও সংশোধনী বাতিল করা হয়।

ফলে আপাতত বিচারক নিয়োগের জন্য আলাদা কোনো আইনগত কাঠামো থাকছে না এবং সুপ্রিম কোর্টের স্বতন্ত্র সচিবালয়ের ভিত্তিও বিলুপ্ত হলো। এর ফলে বিচার বিভাগের প্রশাসনিক কার্যক্রম পূর্বের ব্যবস্থায় ফিরে যাবে।

সচিবালয় গঠনের পটভূমি

বাংলাদেশে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছিল। ১৯৯৫ সালে দায়ের হওয়া একটি মামলার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৯ সালে আপিল বিভাগ স্বাধীন বিচার বিভাগের পক্ষে রায় দেয়।

এর ধারাবাহিকতায় প্রায় ২৬ বছর পর অন্তর্বর্তী সরকার বিচার বিভাগের জন্য আলাদা সচিবালয় গঠনের উদ্যোগ নেয়। ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ’ জারি করা হয়। এর মাধ্যমে নিম্ন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি, শৃঙ্খলা ও নিয়োগসংক্রান্ত দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্টের অধীনে আনার পরিকল্পনা ছিল। পরে ১১ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে সচিবালয়ের কার্যক্রম শুরু হয়।

বিরোধীদের আপত্তি

বিল দুটি উত্থাপনের সময় বিরোধী সদস্যরা তীব্র আপত্তি জানান। পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান বলেন, এটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং সংবিধানের চেতনার পরিপন্থী।

তার অভিযোগ, নিম্ন আদালতকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বিরোধী মত দমনের চেষ্টা চলছে। তিনি আরও দাবি করেন, বিচার বিভাগের স্বাধীন অবস্থান বজায় রাখায় কিছু বিচারককে শোকজ করা হয়েছে এবং অতীতে নির্বাহী নির্দেশ না মানলে বিচারকদের বদলির ঘটনা ঘটেছে।

একইভাবে বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ বাতিলের ক্ষেত্রেও আপত্তি জানান জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্য আখতার হোসেন। তিনি বলেন, অতীতে বিচারক নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব ছিল এবং নতুন কাঠামো সেই প্রভাব কমাতে সহায়ক হতে পারত।

সরকারের ব্যাখ্যা

আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, আইন প্রণয়ন সংসদের এখতিয়ার এবং কোনো আইন অসাংবিধানিক কি না তা নির্ধারণ করবে আদালত। তিনি দাবি করেন, সরকার বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, তবে অতীতে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।

বিচারকদের শোকজ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও জানান, বিচারক নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য করতে নতুন আইন প্রণয়নের কাজ চলছে, যা বৃহত্তর সাংবিধানিক সংস্কারের অংশ হবে।

বিলে যা থাকছে

পাস হওয়া আইন অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত হবে এবং এর অধীনস্থ বাজেট, প্রকল্প ও জনবল আইন ও বিচার বিভাগে স্থানান্তরিত হবে। তবে অন্যান্য আদালতের বিদ্যমান কাঠামো অপরিবর্তিত থাকবে।

অন্যদিকে, বিচারক নিয়োগসংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল হলেও এর অধীনে ইতোমধ্যে সম্পন্ন নিয়োগ ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বৈধ হিসেবে বহাল থাকবে।

সরকারের মতে, স্থায়ী ও কার্যকর আইনগত কাঠামো গড়ে তুলতেই এসব অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়েছে। পাশাপাশি অধিবেশনে ক্রীড়া, জ্বালানি, ক্রয়, অভিবাসন, শ্রম ও স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন খাতে একাধিক সংশোধনী বিলও পাস হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »